ধনতেরাস উৎসব কি? কেন পালন করা হয়? জানুন এর পৌরাণিক ইতিহাস

14
ধনতেরাস উৎসব কি? কেন পালন করা হয়? জানুন এর পৌরাণিক ইতিহাস

মহামারী হোক অথবা ঘূর্ণিঝড়, আমাদের বাঙ্গালীদের পার্বণ কখনো বাদ যায় না। এই কিছুদিন আগে বাঙালি পালন করল দুর্গাপূজা। লক্ষ্মী পুজো পেরিয়ে এবার আমরা এগিয়েছি কালীপুজোর দিকে। কিন্তু কালীপুজোর ঠিক একদিন আগে পালন করা হয় আরো একটি উৎসব, যার নাম ধনতেরাস। মূলত অবাঙালিদের উৎসব এই ধনতেরাস। দীপাবলীর দিন আমরা অনেকেই অলক্ষী কে বিদায় করে লক্ষ্মী পুজোর আয়োজন করি। এই লক্ষ্মী পুজোর দুদিন আগে পালিত হয় ধনতেরাস।

ধন শব্দের অর্থ সম্পদ, এবং তেরাস শব্দের অর্থ ত্রয়োদশী। হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কার্তিক মাসের ১৩ তম দিনে কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। আলোর রোশনাই তে যখন মেতে ওঠে সম্পূর্ণ বিশ্ব,তখন পরিবারের মঙ্গল এবং ধন-সম্পদের আশায় বহু মানুষ দেবতা কুবেরের আরাধনা করেন। এই দিন কোন না কোন মূল্যবান ধাতু, বাসনপত্র অথবা নতুন পোশাক কিনে থাকেন সকলে।

কিন্তু কেন ধনতেরাস উৎসবের দিন নতুন জিনিস কিনতে হয়, একথা আমাদের অনেকেরই অজানা। ধনতেরাস কে ঘিরে রয়েছে অজস্র পৌরাণিক কাহিনী। তারই মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত। শোনা যায় যে, রাজা হিমের ১৬ বছর বয়সী একটি অভিশাপ ছিল যে বিয়ের চার দিনের মাথায় তার সর্প দংশনে মৃত্যু হবে। এই দিনের কথা সকলেই জানতেন। তাই স্বামীকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নববধূ সারারাত স্বামীকে ঘুমাতে দেননি। সারারাত নানা কৌশলে জাগিয়ে রেখেছিলেন তার স্বামীকে।

তাদের শয্যা কক্ষের বাইরে প্রচুর ধন-সম্পদ, সোনা রুপোর গয়না, বাসনপত্র সাজিয়ে রেখেছি নববধূ। ঘরের সর্বত্র প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। এতো ভালো থাকার জন্য সারারাত সেই ঘরে প্রবেশ করতে পারেনি। স্বামীকে জাগিয়ে রাখার জন্য সারারাত নববধূ গল্প এবং গান করে কাটিয়ে ছিলেন।

পরদিন মৃত্যুর দেবতা যমরাজ সেখানে আসেন। ঘরের দরজায় গয়নার জৌলুস এবং প্রদীপের আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে যায় তার। তিনি রাজপুত্রের কাছে পৌছাতে পারলেন না। রাজপুত এর ঘরের বাইরে বসে সারারাত ওই গয়নার ওপর শুয়ে শুয়ে রানীর গান এবং গল্প শুনে বিভোর হয়ে। পরে দিকভ্রান্ত হয়ে তিনি বাড়ি ফিরে যান।

এই ঘটনার পর থেকে প্রতিবছর রাজ পরিবারে সোনার এবং রুপোর তিনি ধনতেরাস উৎসব পালন করা শুরু হয়ে যায়। কুবেরের সাথে এই দিন লক্ষ্মী দেবীর আরাধনা করা হয়। ব্যবসায়ীদের জন্য এই দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। দীপাবলীর দুইদিন আগে লক্ষ্মী পুজোর আয়োজন করা নিয়েও রয়েছে একটি পৌরাণিক গল্প।

পুরাণে বলা হয়েছে যে, একসময় দুর্বাসা মুনির অভিশাপে সৌভাগ্যের দেবী লক্ষ্মীর গৃহছাড়া হয়েছিলেন। লক্ষ্মী চলে যাওয়াতে স্বর্গলোক শ্রীহীন হয়ে পড়ে।দেবতারা অসুরের সঙ্গে আমরণ যুদ্ধ করে সমুদ্র মন্থনে আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন লক্ষীকে। এই দিনটি ছিল ধনতেরাসের দিন।তাই তখন থেকেই দেবী লক্ষ্মীর উদ্দেশ্যে সূচনা করা হয়েছিল দীপাবলি উৎসব।

দীপাবলীর আগের দিন আমরা পালন করি ভূত চতুর্দশী। এই দিন বাড়িতে চৌদ্দটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে হয়। তার সঙ্গেই আমরা সেই দিন ১৪ রকমের শাক খাই। এই দিনটিকে অনেকেই বলে থাকে ছোটি দিওয়ালি।দীপাবলি রাতের প্রদীপ জ্বালিয়ে অশুভ শক্তিকে বিতাড়িত করে শুভ শক্তির আরাধনা করা হয়। এই দিন অনেকে বাড়ির মঙ্গল কামনার উদ্দেশ্যে সাধ্যমত ধাতু অথবা গয়না কেনেন। প্রত্যেকটি সোনার দোকানে পাওয়া যায় বিশেষ ছাড়। বেশ কিছু বছর ধরে বাঙ্গালীদের মধ্যে ধনতেরাস পালনের চলা শুরু হয়েছে। সকলের পাশাপাশি বাঙালি হিন্দু পরিবারের প্রত্যেককে পালন করেন এই ধনতেরাস উৎসব।