“প্রণব মুখোপাধ্যায়ের অভাব কোনদিনও পূরণ হবে না” শোকস্তব্ধ দেশবাসী

59

চলতি বছরে আরো একটি দুঃসংবাদ বয়ে নিয়ে এলো সকলের কাছে। ভারতবর্ষের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় গতকাল প্রয়াত হয়েছেন। কিছুদিন ধরেই তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভর্তি ছিলেন হাসপাতালে। শারীরিক অসুস্থতা সাথে সাথে তিনি করণায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার মহাপ্রয়াণে স্তব্ধ রাজনীতি মহল থেকে সাধারণ মানুষ সকলেই।

এই অবস্থায় প্রণব মুখোপাধ্যায় দিদির বাড়ি কিন্নাহার এর পরোটা গ্রামের বাসিন্দাদের এতদিন অবস্থা ছিল আরো শোচনীয়। ঘরের ছেলে এতদিন দিল্লির সিনা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে লড়াই করছিলেন মৃত্যুর সাথে। হাজার প্রার্থনা, পূজার্চনা সবকিছুকে মিথ্যা করে দিয়ে চলে গেলেন তাদের ঘরের ছেলে পল্টু। দুঃসংবাদ পাওয়ার পর থেকেই যেন থমকে গিয়েছে বীরভূমের বিটি এবং কিনাহার। এ বছর দুর্গা পূজার সময় শোনা যাবে না তাদের ঘরের ছেলের গলায় চণ্ডীপাঠ, একবার ও চোখের দেখা দেখতে পাওয়া যাবে না রাইসিনা হিলস নিবাসী কে। এই কথা যতবার মনে আছে ততোবারই কান্নায় ভেঙে পড়েছে সেখানকার মানুষেরা।

ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের জন্ম হয় মিরিতি গ্রামে। বাবা কামদাকিঙ্কর মুখোপাধ্যায় ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। মা রাজলক্ষ্মী মুখোপাধ্যায় গৃহবধূ। প্রণব মুখোপাধ্যায় কীর্ণাহার শিব চন্দ্র উচ্চবিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছিলেন। এরপরে সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে পাশ করেন স্নাতক। পরবর্তী সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পলিটিকাল সায়েন্স এবং ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৫৭ সালে তিনি শুভ্রা মুখোপাধ্যায় কে বিয়ে করেন। পরিবার সূত্রে খবর, তারা পরিবারের দুই ভাই এবং চার বোন ছিলেন। খুব ছোটবেলায় প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মা মারা যান। বড়দিদি অন্নপূর্ণা মুখোপাধ্যায় তাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছিলেন।

ছোটবেলা থেকেই প্রণব বাবু ছিলেন খুবই মেধাবী। জীবনের পথে চলাই বহু সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন তিনি। তবে কখনো শিকড়ের টান কে অস্বীকার করেনি প্রণব মুখোপাধ্যায়। সারাবছর বহু ব্যস্ততার মধ্যে সময় না পেলেও দুর্গাপূজার সময় তিনি রাজনীতিতে পিছনে ফেলে প্রকৃত অর্থে হয়ে উঠতেন একটি বাঙালি সন্তান। প্রতি বছর তিনি চলে আসতেন মিরিতির বাড়িতে। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের কথা তিনি মন দিয়ে শুনতেন। তার গ্রামের বাড়িতে পুজো হয়ে যাবার পর বাড়ির উঠোনে পাতা হতে একটি ইজি চেয়ার। সেখানে বসে গ্রামের প্রতিটি মানুষের অভাব অভিযোগ তিনি মন দিয়ে শুনবেন।

প্রণব বাবু নাড়ু খেতে ভালো বাসতেন। পুজোর সময় তাকে নারকেল ছোলা, তিল সহ বিভিন্ন রকমের নাড়ু করে দেওয়া হতো। তিনি নিজে অষ্টমীর দিন চন্ডী পাঠ করতেন। দিদির বাড়ি দোতলায় তার জন্য রাখা থাকতে একটি নির্দিষ্ট ঘর। ঘরে ছেলেটি ছোট্ট লাইব্রেরী। সেখানে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বই রাখা থাকতো। শুধুমাত্র দেশ-বিদেশের বই নয়, বাটুল দ্যা গ্রেট থেকে হাদাভোদা সব রকমের কমিক্স পড়তে ভালোবাসেন।

প্রণব বাবু র দীর্ঘদিনের সহকারি রবি চট্টরাজ জানিয়েছেন যে,”আমি আমার অভিভাবক হারালাম’। তিনি বীরভূমের মানুষ এবং এই জেলার উন্নয়নের কথা সব সময় ভাবতেন। তিনি গ্রামের প্রতিটি মানুষের নাম জানতেন, গ্রামে এলে তিনি তাদের খোঁজ নিতেন।

গ্রামের বাসিন্দা তুহীন ঘোষ জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় জানান যে,”প্রণব মুখোপাধ্যায় আমাদের গ্রামের মানুষের অভিভাবক ছিলেন। যে মানুষ তার কাছে কোনদিন সাহায্য চেয়েছে, সে কোনদিন খালি হাতে ফিরে আসেনি। তার অভাব কোনদিনও পূরণ হবে না”।