কি করে হল বুড়িমার চকোলেট বাজি? জানুন এই নামের পেছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস

14
কি করে হল বুড়িমার চকোলেট বাজি? জানুন এই নামের পেছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস

আর কিছুদিনের মধ্যেই আসতে চলেছে কালীপুজো। কালী পুজো মানেই মানুষের মনে একটাই আনন্দ, আলোর রোশনাই তে ভেসে যাওয়া। আমরা সকলেই ছোট থেকে বড়, বাজি ফাটাতে ভালোবাসি। যদিও এখন শব্দবাজি একেবারেই নিষিদ্ধ, কিন্তু তাও যে কোন অকেশনে আমরা বুড়িমার বাজি ফাটিয়ে থাকি। কিন্তু কখনো আমাদের মনে এই প্রশ্ন আসেনি, কেন এই ব্র্যান্ডের নাম বুড়িমা। কী রহস্য রয়েছে তার পেছনে। তাহলে আসুন আজকে জেনে নেওয়া যাক এই নামের পেছনের লুকিয়ে থাকা ইতিহাস।

তথ্য খুঁজতে গিয়ে যা জানা গেল, আমরা যাকে বুড়িমা বলে চিনি তার ভালো নাম অন্নপূর্ণা দাস। তার জন্ম ফরিদপুরে। দেশভাগ যখন হয় তখন তার জায়গা হয়েছিল ধল দিঘি সরকারি ক্যাম্পে। এই দেশ ভাগ হওয়ার সময় উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া একজন মেয়ের প্রতিটি কষ্টের সাক্ষী রয়েছে এই ব্র্যান্ড। এটি শুধু কোন চকলেট বোমা নয়, এর পেছনে রয়েছে একটি বাঙালি মেয়ের কষ্টের কাহিনী।

১৯৪৮ সালে যখন দাঙ্গা বিধ্বস্ত অন্নপূর্ণা দেবী পূর্ব পাকিস্তান থেকে এই শহরে এসেছিলেন, তখন তার কোলে ছিল তিনটি সন্তান। এই সন্তানদের রক্ষা করার জন্য অন্নপূর্ণার মতো তিনি প্রতিমুহূর্তে লড়াই করে গেছেন তার জীবনের সঙ্গে। যাবতীয় গ্লানি ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তিনি বিক্রি করেছেন বাজারে কাচা আনাজ। নির্দ্বিধায় রাতের পর রাত বিড়ি বেধে গেছেন অক্লান্ত পরিশ্রম করে। সেই উপার্জনের রক্ত জল করা অর্থে তিনি একটি কারখানা গড়ে তোলেন।

পরে আস্তে আস্তে তিনি আলতা এবং সিঁদুরের ব্যবসা শুরু করেন। ততদিনে তিনি বেলুড়ে চলে এসেছেন। তিনি নিজের একটি বাড়ি করেছেন। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। সময়ের কালে কালে চুল পেকেছে তার। তার দোকানে যখন ছেলে মেয়েরা বাজি কিনতে আসত, তখন তিনি শুনতে পেতেন বুড়িমার বাজির গল্প। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি এও বুঝতে পেরেছিলেন যে, অন্যের থেকে এনে বাজি বিক্রি করার থেকে অনেক বেশি লাভ যদি নিজে উৎপাদন করা যায়।

এ কথা মাথায় আসতেই তিনি আর দেরি করেননি। ছেলে সুধীর নাথকে নিয়ে তিনি শুরু করেন ব্যবসা। বাজির ব্র্যান্ডের নাম দিলেন বুড়িমা। তার ছেলে চকলেট বোম বানানোর কৌশল শিখে নিলেন। ব্যাস, আর তাদের পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি কোনদিন। তারপর থেকে দীপাবলি হোক অথবা ভারত পাকিস্তানের ম্যাচ, বাঙালির হাতে সব সময় দেখা গেছে বুড়ি মাকে। অবশ্য শুধুমাত্র বাংলায় বললে ভুল বলা হবে, তামিলনাড়ু তে একটি দেসলাই কারখানা ছিল তার।

নব্বইয়ের দশকে মৃত্যু হল বুড়িমার। তারপর ১৯৯৬ সালে শব্দবাজি নিয়ন্ত্রণ করা হলো সরকারের তরফ থেকে। সেই থেকেই আস্তে আস্তে বুড়িমার ব্যবসায় ক্ষতি হতে শুরু করে। কিন্তু ততদিনে অন্নপূর্ণা দেবী পরলোকগমন করেছেন। কিন্তু সবকিছু চলে গেলেও আজও আমরা মনে রাখি বুড়ি মাকে। সেই নারীকে মনে রাখি, যিনি শিক্ষিত না হয়েও শুধুমাত্র বুদ্ধির জোরে একটি ব্যবসা দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আজও প্রতিটি মেয়ের কাছে একজন আদর্শ।