রাণুর কাছে পৌঁছানোর বদলে পকেট ভরছে দালালদের!

8
রাণুর কাছে পৌঁছানোর বদলে পকেট ভরছে দালালদের!

রানাঘাট স্টেশনে গান গেয়ে নেটবাসীদের দৌলতেই রাতারাতি জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছেছিলেন রাণু মন্ডল। প্ল্যাটফর্মে বসেই খালি গলায় গান ধরেছিলেন রাণু, পরনে ছিল নোংরা ছেঁড়া পোশাক, মুখে চোখে লেগে ছিল ময়লা। কিন্তু তার গান শুনে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন এক পথচারী। সেই গান রেকর্ড করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করতেই ঝড়ের গতিতে তা ভাইরাল হয়ে যায়। আর তারপরেই ঘটেছিল ম্যাজিক।

সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে সেই ভিডিও যে হিমেশ রেশমিয়ার কাছে পৌঁছে যাবে তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে নি স্বয়ং রাণু মন্ডল। এরপর হিমেশ রেশমিয়ার দৌলতে রাণুর সেই প্রতিভা পৌঁছে যায় সারা বিশ্বের দরবারে। রাণুর সঙ্গে ডুয়েটে গান বাঁধেন হিমেশ – ‘তেরি মেরি কাহানি’। আর তার সেই গান শোনা গিয়েছিল গত বছর প্রত্যেক পুজো মন্ডপে। সেই গান মুখে মুখে ফিরেছিল জনসাধারণের। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই রাণু মন্ডলকে ফিরে আসতে হয় সেই পুরোনো পরিস্থিতিতেই।

তাঁর জীবন নিয়ে কখনো যে বায়োপিক তৈরি হবে, তাও বোধহয় কখনও ভাবতে পারেননি রাণু। শৈশব থেকেই চরম দারিদ্র্যে বেড়ে ওঠা রাণুর। মেয়ে হয়ে জন্মানোয় কপালে জুটেছিল শুধুই অবহেলা। মাসির কাছে চলে আসেন খুব ছোটবেলায়। কিন্তু মাসি পড়াশোনা তো শেখাননি বরং মাসির বাড়িতে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হত রাণুকে। রেডিও শুনে শুনেই গান শিখেছিলেন তিনি।

শৈশবে মাকে নির্যাতিত হতে দেখতেন রাণু। তারপর রাণুরও বিয়ে হয়। মেয়ে সন্তানের জন্ম দেন তিনি। কিন্তু বড় হতেই সেই মেয়ে অকৃতজ্ঞের মতো মাকে ছেড়ে চলে যায় এবং নিজে সংসার পাতে। রাণু মনে করেন, ঈশ্বর চাইলে মেয়ে নিশ্চয়ই ফিরবে। একসময় নাকি মুম্বইয়ে লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ করতেন রাণু। পরবর্তীকালে সেই মুম্বইয়ের মাটিতেই পেয়েছেন গায়িকার সম্মান। কিন্তু বড় তাড়াতাড়ি মানুষ তাঁকে ভুলে গেল।

এ প্রসঙ্গে রাণু বলেন, তাঁর গানের যখন আকাশছোঁয়া কদর, তখন লোকজনের কাছে তাঁর অনেক খাতির ছিল। কিন্তু রাণাঘাট স্টেশনে বসে ভিক্ষা করার সময় তাঁর দিকে কেউ ফিরেও তাকাতো না। পরিস্থিতিই রাণুকে মানুষ চিনিয়েছে। এখন কারো কৃত্রিম মিষ্টতা রাণুর একদম পছন্দ হয় না। একসময় যাঁরা রাণুর কাছে গান্ডে-পিন্ডে খেয়েছেন, তাঁরা এখন রাণুকে একমুঠো ভাত দিতে কষ্ট পান।

অপরদিকে রাণু মন্ডলকে কেন্দ্র করে চলছে ভরপুর ব্যবসা। রাণাঘাট স্টেশনে নেমে রাণুর বাড়ি যেতে চাইলেই দালালরা পথ আটকে বলেন, অনুমতি ছাড়া ওই বাড়িতে ঢোকা যাবে না। আর সেই অনুমতির অর্থ হল টাকা যা রাণুর কাছে পৌঁছানোর বদলে দালালদের পকেট ভরায়। অথচ এত কিছু রাণু জানেন না। তাঁর কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই। যা দু’দশ টাকা সম্বল, তা সবটাই ছেঁড়া লাল কাপড়ে ভরে ঘরেই রেখে দেন। তাঁর আরাধ্য দেবতা যীশু খ্রীস্ট তাঁর আয় জানেন। সকালের টিফিনে পরোটা বা দুটি গরম রুটি ও আলুর তরকারি রাণু খেতে চান, কিন্তু তার কপালে সেটুকুও জোটে না।

প্রতিবেশীদের কথায়, চিকেন দিতে গেলে রাণু কুকুরের মাংস বলে ফেলে দেন। প্রতিবেশীর দেওয়া খাবারে বিষ মেশানো আছে বলে মনে করেন রাণু। আসলে আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারেন না তিনি। আসলে বারবার বিশ্বাস ভাঙতে ভাঙতে হয়তো এতটাই অবিশ্বাসের পাথর জমেছে রাণু মন্ডলের মনে।