নার্সের তাৎক্ষণিক বুদ্ধির জেরে জমজ দিদির আলিঙ্গনে জীবন ফিরে পেয়েছিল বোন

22
নার্সের তাৎক্ষণিক বুদ্ধির জেরে জমজ দিদির আলিঙ্গনে জীবন ফিরে পেয়েছিল বোন

একে বিয়ের প্রায় সাত বছর পরে সন্তানের আগমন ঘটেছিল তাদের বাড়িতে, তারমধ্যে একইসঙ্গে জমজ। এই আনন্দ ধরে রাখার জায়গা ছিল না ম্যাসাচুসেটসের জ্যাকসন দম্পতির মনে। স্ত্রী কে দেখাশোনা করার জন্য নিজের ব্যবসা প্রায় লাটে তুলতে বসেছিলেন তাঁর স্বামী পল জাকসন। ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসের ঘটনা এটি।

প্রভু যীশুর দেওয়া উপহার, কিভাবে গ্রহণ করবেন তা নিয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত হচ্ছিলেন জাকসন দম্পতি। কিন্তু তার মধ্যেই সবকিছু এলোমেলো করে দিল ডাক্তারের রায়। তারা জানালেন যে, গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধির হার খুবই আশঙ্কাজনক। তাই সময়ের আগে সিজার করতে হবে। না হলে বাচাঁনো যাবে না কাউকে।

নির্দিষ্ট তারিখের প্রায় ১২ সপ্তাহ আগে বাধ্য হয়ে সিজার করতে হলো। অপুষ্ট দুই কন্যা কাইরি এবং ব্রিয়েল এইভাবে পৃথিবীর আলো দেখেছিল সেইদিন। ব্রিয়েল তার বোনের থেকে মিনিট কয়েকের ছোট। ভীষণ কম ওজন ছিল দুই বোনের। এক জনের যেমন ওজন ছিল ৯৯২ গ্রাম তেমনই অন্যজনের ওজন ছিল ৯০৭ গ্রাম।

ইনকিউবেটর এর মধ্যে দ্রুত বাড়তে শুরু করেছিল কাইরির ওজন। কিন্তু অন্যদিকে ব্রিয়েল ক্রমশ হারিয়ে ফেলছিলো তার জীবনী শক্তি। আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়ে আসছিল সে। একইসঙ্গে দেখা গিয়েছিল হৃদপিন্ডের সমস্যা। ওজন বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন দেওয়ার পরেও রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা অস্বাভাবিক ভাবে কমে যাচ্ছিল।

তার বাঁচার আশা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। ততক্ষণে অন্যদিকে সুস্থ-সবল দিদি কাইরি হাত-পা ছুর ছিল। নভেম্বরের ১২ তারিখে ব্রিয়েলের অধিক অবস্থা চূড়ান্ত অবনতি ঘটে ছিল। সামান্য একটি বাতাসের জন্য লড়াই করতে হয়েছিল তাকে। সমস্ত শরীর আস্তে আস্তে নীল হয়ে যাচ্ছিল। অত্যাধিক ভাবে হার্টবিট কমে গিয়েছিল। হেচকি তুলতে শুরু করেছিল সে। হাসপাতাল থেকে ফোন করার পর সেই দম্পতি তাড়াতাড়ি হাসপাতালে ছুটে আসেন। মেয়ের সময় ফুরিয়ে আসছে জেনে রীতিমতো কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তারা।

চিকিৎসক এবং নার্স যারপরনাই চেষ্টা করেছিলেন যাতে ব্রিয়েল কে বাঁচানো যায়। কিন্তু কোনভাবেই ব্রিয়েল শ্বাস নিতে পারছিল না। ঠিক এই সময় হঠাৎ করে সিস্টারদের মনে পড়ে গেল যে, ডাবল বিল্ডিং এর কথা। ডবল বেডিং হলো, সদ্যোজাত বা সময় লাগে জন্ম নেওয়া পুত্র সন্তান অন্য যমজ সন্তানকে একই ইনকিউবেটরে রাখার পদ্ধতি।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এটি প্রচারিত হলেও তখনো আমেরিকায় এই পদ্ধতির প্রচলন ছিল না। শিশুর জীবন বাঁচানোর জন্য এই অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সিস্টার কাসপারিয়ান। প্রথাগত পদ্ধতি ভেঙে দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিতে তিনি বেশিক্ষণ ভাবেননি। এর জন্য তার চাকরি চলে যেতে পারত। কিন্তু সেই সমস্ত ব্যাপারকে তোয়াক্কা না করে তিনি দুই সন্তানকে একইসঙ্গে এনে রাখলেন।

ততক্ষণে ব্রিয়েলের শরীরে খিচুনি এসে গিয়েছিলো। তার বাবামা বুঝতে পেরেছিল যে, হাতে হয়তো রয়েছে আর কয়েক মিনিট। তাই তারা সিস্টারের কথায় সম্মতি জানিয়ে দিলেন। আর এক মুহূর্ত দেরি করতে চাননি সিস্টার। জন্ম নেবার পর প্রথম দুই সন্তানকে একইসঙ্গে রাখা হল। ঠিক তার পরই ঘটে গেল মিরাক্কেল। সকলে অবাক চোখে দেখলেন যে, ইনকিউবেটরের ঢাকনা বন্ধ করার আগেই তারা দুজনে গুটিসুটি মেরে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে বৃয়েলের খিচুনি বন্ধ হয়ে গেল। আগের মত অক্সিজেন মাত্র ফিরে পেল সে।

অন্যদিকে দিদি তখন ঘুমাচ্ছিল। বোন কাছে আসার পর হঠাৎ করেই জেগে উঠলো সে। সবাইকে চমকে দিয়ে মৃতপ্রায় বোনকে বা হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল। দিদির আলিঙ্গনে ক্রমশ জীবন ফিরে আসছিল বোনের। ত্বকের রং স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। কি সেই সময় একজন চিত্রসাংবাদিক হাসপাতালের ছবি তুলতে এসেছিলেন। খবরটি শুনে সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন ক্যামেরা নিয়ে। তার ক্যামেরায় ফুটে উঠেছিল এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য এবং ঘটনার কিছু মুহূর্ত।